একাকী একেবারে শূন্য থেকে ক্যাম্পেইন শুরু…

অনেকেই অ্যাক্টিভিজমের সাথে যুক্ত হতে চান, কিন্তু, কিভাবে শুরু করতে হয় তা জানেন না। তাদের জন্য এই লেখায় খুব সংক্ষেপে কয়েকটি ধাপের মাধ্যমে ক্যাম্পেইন শুরুর প্রক্রিয়া বর্ণনা করা হচ্ছে-
পুরো বিষয় কয়েকটি ভাগে ভাগ করে নিই-
১। সদিচ্ছা/নিয়্যাত ঠিক করা।
২। নিজের এলাকা বা যেখানে কাজ করব সেখানের পরিবেশ ক্যাম্পেইনের উপযুক্ত করা।
৩। প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস-এর ব্যবস্থা করা।
প্রথম ধাপ: “নিশ্চয়ই সমস্ত কাজ নিয়্যাতের উপর নির্ভরশীল।”[১]
আমরা কেন ক্যাম্পেইন শুরু করব তা আগে ঠিক করতে হবে। এই ক্যাম্পেইন হবে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য। আল্লাহকে খুশি করতে তার বান্দাদের পাপ কাজ থেকে বিরত রাখা এবং ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দুনিয়াবি কোনো লাভ-ক্ষতি আমরা খুঁজব না। সেলিব্রিটি হতে ক্যাম্পেইন শুরু করব না এবং কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক ফায়দা লাভের জন্যেও এই ক্যাম্পেইন শুরু করব না।
প্রিয় ভাই, আজ যুবসমাজ খুব বিপর্যস্ত। আপনি একটু গভীরভাবে খেয়াল করে দেখুন, তাদের অধিকাংশই পর্নগ্রাফি, গেইম, মাদকের মতো ভয়ঙ্কর সব আসক্তিতে ভুগছে। ডিভাইস ছাড়া কিছুই বুঝে না। বাবা মা ভাই বোন কোনো কিছুর ভালোবাসাই তাদের মন ছুঁয়ে যায় না। একটা ডিভাইস না পেয়ে অভিমান করে আত্মহত্যার পথ খুঁজে নিচ্ছে অনেক কিশোর! এই কিশোররা অন্য কোনো গ্রহ থেকে আসেনি, তারা আমাদেরই ভাই-বোন। তাদের সচেতন করার দায়িত্বও তাই আমাদের। এই দায়িত্ব যারা নিতে প্রস্তুত তাদের জন্যই আমাদের ক্যাম্পেইন। একটি হাদিস মনে পড়ল, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন, “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। আর প্রত্যেকেই তার অধিনস্তদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।”[২]
দ্বিতীয় ধাপ: আপনি যদি নিজের পরিবার এবং সমাজকে রক্ষায় এগিয়ে আসতে চান এবং আপনার নিয়্যাত যদি হয় সঠিক তাহলে এই ধাপ খেয়াল করুন।
ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা খুব কঠিন এই কথাটা সবার প্রথমে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে। এটা খুব সহজ একটা কাজ। লক্ষ্য করুন, ধরুন দিপু ক্লাস এইটে পড়ে। সে চাচ্ছে একটা অডিটোরিয়াম ভাড়া করে ৫০০ মানুষ দাওয়াত করে এনে ২ ঘন্টা লেকচার দিয়ে পর্নোগ্রাফির ক্ষতি সম্পর্কে বোঝাবে, এটা কি সম্ভব? অডিটোরিয়াম ভাড়া করার খরচ, ৫০০ মানুষকে দাওয়াত দিয়ে আনার মতো পরিচিতি, ২ ঘন্টা লেকচার দেওয়ার মতো যোগ্যতা সাধারণত এই বয়সী কারো মধ্যে থাকে না। এমন করে যোগ্যতা এবং সামর্থের বাইরে গিয়ে ক্যাম্পেইনের চিন্তা করলে অবশ্যই কঠিন মনে হবে।
তবে দিপু যদি ক্যাম্পেইনটা এভাবে শুরু করে তাহলে আশা করি খুব কঠিন হবে না-
দিপু প্রথমে দেখল তার বন্ধুবান্ধব বা পরিচিতজনের মধ্যে কেউ তার মতো অ্যাক্টিভিজম করতে চায় কিনা। সমাজের মানুষের জন্য কাজ করতে চায় কিনা। একটু খুজতেই মোটামুটি কয়েকজনের (৩ জন হলেও শুরু করতে যথেষ্ট) টিম হয়ে গেল। এবার বুদ্ধি পরামর্শ করে দেখল তাদের পক্ষে কতটুকু করা সম্ভব। তারা ২/৩ জন মিলে হয়ত ছোটো করে লিফলেট বিতরণ করতে পারবে, বা এলাকার মসজিদের আশপাশ পরিষ্কার করতে পারবে বা ছোটো আকারে ষোলো ম্যাগাজিনের পাঠচক্র করতে পারবে। এই ছোটো আকারেই একটা ক্যাম্পেইন করে ফেলল তারা। আরেকবার বলি, শুরুতেই বিশাল ক্যাম্পেইনের চিন্তা করলে শুরু করাটাই হয়তো হবে না। তাই সামর্থ্যের কথা মাথায় রেখে ছোট করে হলেও দ্রুত শুরু করে দিতে হবে। শুরু করাটাই আসল। চলতে চলতে কাজ এমনিতেই বড় হতে থাকবে ইনশাআল্লাহ।
সাধারণত শুরু করার ক্ষেত্রে যেগুলো নিয়ে ঝামেলা হয় এমন কিছু বিষয় হচ্ছে-
অনেক সুন্দর ক্যাম্পেইনের আইডিয়া এসেছে, কিন্তু:
১। মানুষ কম- শুরুতে মানুষ সবসময়ই কম থাকে। কাজ জারি রাখলে মানুষ বাড়তে থাকে। ২/৩ জন হলেই শুরু করে দেওয়া যায়। এমনকি ১ জন মানুষ একাকীই ক্যাম্পেইন করতে পারেন। ২০/৩০ টা লিফলেট বিতরণ করা কি এমন কঠিন কাজ?
২। টাকার সমস্যা- ক্যাম্পেইনের জন্য ক্যাম্পেইন সামগ্রী(লিফলেট-বই- ম্যাগাজিন ইত্যাদি) কিনতে হবে কিন্তু টাকা নেই। যেহেতু টাকা নেই তাহলে ক্যাম্পেইন ও নেই। পরে করব টাকা হলে।
ক্যাম্পেইন হবে না এমন চিন্তাই করা যাবে না। টাকা না থাকলে নিজেরা মিলে কতো ম্যানেজ করা যায় তা দেখতে হবে। তারপরও টাকা না হলে বই কিনার দরকার নেই। মুক্ত বাতাসের খোঁজে, ষোলো ম্যাগাজিন, আকাশের ওপারে আকাশ ইত্যাদি বইয়ের ফ্রি পিডিএফ আছে। সবাই মিলে পিডিএফ থেকে পড়ে ক্যাম্পেইন শুরু করে দিতে পারেন। আর নিজেরা একটু কষ্ট করলেই টাকা ম্যানেজ করা যায় আসলে। ধরুন আপনারা ২ জন আছেন। ২ জন দিনে ৫ টাকা করে জমালে দিনে জমা হবে ১০ টাকা। ৩০ দিনে ৩০০ টাকা। এই ৩০০ টাকা দিয়ে আপনি চাইলে ১০০ টার মতো লিফলেট কিনতে পারবেন। অনেকগুলো ষোলো ম্যাগাজিন কিনতে পারবেন।
৩। ক্যাম্পেইন করার জায়গা নাই। স্কুল কলেজে অনুমতি নিবো কিভাবে ভয় হয়। থাক ক্যাম্পেইনের দরকার নাই। আমরা ছোটো, অভিজ্ঞরাই করুক।
এই চিন্তা করলে জীবনে আর বড়ো কিছু করা যাবে না। কিছু বুদ্ধি দিই এখানে। প্রথম ক্যাম্পেইনই কোনো ইউনিভার্সিটি বা কলেজে করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আমি বলব এমন করাও উচিত না (যদি কারো পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকে এমন বড়ো জায়গাগুলোতে অন্য কোনো ক্যাম্পেইন করার তাদের কথা আলাদা। আমি এখানে নতুনদের কথা বলছি।)
জায়গার অভাব নাই দুনিয়ায়। প্রথম দিন লিফলেট হাতে নিয়ে কয়েকজন মিলে হাঁটতে বের হন। উদ্যেশ্য হচ্ছে যদি সময় সুযোগ মিলে যায় তাহলে কয়েকজনকে অল্প কিছু কথা বলে লিফলেট দিয়ে দিবেন। সময় সুযোগ এজন্য বললাম, আপনি খেয়াল করবেন বের হওয়ার পর লিফলেট দিতে খুব লজ্জা করবে। কে কী ভাববে এগুলো মনে হবে। বেশি মানুষ এলাকায় থাকলে তো কোনো ভাবেই লিফলেট বের হতে চাবে না। এতকিছুর পরও দেখবেন সুযোগে ৫/৭ জনকে ঠিকই লিফলেট দেওয়া হয়ে গেছে।
এভাবে কয়েকদিন হাঁটতে গিয়ে অপরিচিতদের মধ্যে লিফলেট দিয়ে শুরু করতে পারেন। একটু অভিজ্ঞতা এবং সাহস হলে ছোটখাটো কোচিং সেন্টারে গিয়ে ৫-১০ মিনিট যতটুকু সম্ভব হয় কথা বলে হাতে লিফলেট দিয়ে আসতে পারেন। এভাবে কিছুদিন ক্যাম্পেইন করার পর স্কুল কলেজে গিয়ে অনুমতি নেওয়া যেতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুমতি চাওয়ার সময় সমাজের বিভিন্ন শ্রেনীর ৩-৪ জন মিলে যাওয়া ভালো। যেই প্রতিষ্ঠানের অনুমতি চাইতে যাবেন, যাওয়ার আগে সেখানকার কমিটির লোক বা সমাজের কোনো মুরব্বি মানুষকে সাথে নিলে কাজ অনেক সহজ হবে ইনশাআল্লাহ। আশাকরি আপনারা গুরুত্ব বোঝাতে পারলে অনুমতি পেয়ে যাবেন। অনুমতি নেবার ক্ষেত্রে আপনি গাইডলাইন পেতে পারেন হ্যান্ডবুক-০৪ এ আলোচিত এই লেখাগুলো থেকে -
- অনুমতিপত্র
- মসজিদকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মসূচী পালনের জন্য মসজিদ কমিটির অনুমতি পাবার সহজ উপায়
- ক্যাম্পেইনের অনুমতি নেওয়ার সাধারণ মূলনীতি
- সহজেই ক্যাম্পেইনের অনুমতি পাওয়ার উপায়
তৃতীয় ধাপ: ক্যাম্পেইন শুরু করতে টাকা পয়সা তেমন লাগে না বললেই চলে। একদম ফ্রিতেই ক্যাম্পেইন করা যায়, মানুষদের সচেতন করা যায়। আরেকটু বিস্তারিত বলি, ক্যাম্পেইনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে কোনো বিষয় সম্পর্কে মানুষকে কিছু জানান এবং জনসচেতনতা তৈরি করা। এখন চাইলেই আপনি মুক্ত বাতাসের খোঁজে বইটা ফ্রিতে ডাউনলোড করার পর পড়ে পর্নোগ্রাফি সম্পর্কে মোটামুটি জ্ঞান নিতে পারবেন এবং আল্লাহর দেওয়া ফ্রি সাউন্ডবক্স ব্যবহার করে মানুষকে সচেতন করতে পারবে।
ভাইয়েরা মিলে অল্প কিছু টাকার ব্যবস্থা করতে পারলে লস্টমডেস্টির লিফলেটগুলো ছাপিয়ে বা অর্ডার করে বিতরণ করতে পারবেন। আমাদের পরামর্শ থাকবে আপনারা এই টাকা নিজেরাই ব্যবস্থা করে সংগ্রহ করবেন। ভলান্টিয়ারদের বাইরের কেউ টাকা দিয়ে সাহায্য করতে চাইলে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিস তার থেকেই কিনে নিবেন এবং হিসাব খুব ক্লিয়ার রাখবেন। জানেন-ই তো টাকার কেলেংকারি খুব খারাপ জিনিস।
তাহলে এবার সামগ্রিকভাবে পুরো প্রক্রিয়া দেখা যাক-
১। আপনি একা বা আপনার ২/৩ জন বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন অ্যাক্টিভিজমে যুক্ত হবেন।
২। আপনারা নিজেরা অল্প অল্প করে চাঁদা দিয়ে কিছু ফান্ড ম্যানেজ করলেন।
৩। এই ফান্ড দিয়ে ক্যাম্পেইন সামগ্রী কিনলেন (ম্যাগাজিন, লিফলেট, পোস্টার, হালকা খাবার দাবার…)
৪। ছোটো আকারে ক্যাম্পেইন করলেন। (২০/৩০ টা বা সাধ্যমত লিফলেট বিতরণ, ছোটোআকারে ষোলো পাঠচক্র, রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা ইত্যাদি)
৫। ক্যাম্পেইনের ছবি/ভিডিও করে রাখলেন।
৬। ফেইসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পেইজ/একাউন্ট খুললেন। এলাকার নাম যুক্ত করে। যেমন- কুমারপাড়া তরুণ সংঘ, উত্তরা ইয়ুথ ক্যাটালিস্ট ইত্যাদি।
৭। ক্যাম্পেইনের ছবি/ভিডিও সেই পেইজ/একাউন্ট থেকে সকল সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করলেন, স্থানীয় গ্রুপগুলোতে ছড়িয়ে দিলেন, সবার ইনবক্সে ইনবক্সে দিলেন।
৮। ছবি ভিডিওর ক্যাপশন থাকলো- আমরা এধরণের জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ চালু রাখতে চাই। আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। অনুগ্রহ করে আমাদের সহযোগিতা করুন। মূলভাব বুঝে নিন। তারপর নিজের মতো করে সাজিয়ে পোস্ট করুন।
৯। একবার ক্যাম্পেইন করার পর দেখবেন বেশ কিছু মানুষ আপনাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফান্ড দিচ্ছে। তাদের সাথে নিয়ে আপনি আবার ক্যাম্পেইন করুন। এভাবে ক্রমাগত ক্যাম্পেইন জারি রাখলে আপনার সঙ্গে অনেক মানুষ অ্যাক্টিভিজমে যুক্ত হয়ে পড়বে ইনশা আল্লাহ।
বিঃ দ্রঃ এখানে পর্ণ আসক্তি নিয়ে লিফলেট বিতরণের কথা বলা হয়েছে, মুক্ত বাতাসের খোঁজে বই এর ক্যাম্পেইনের কথা বলা হয়েছে, শুধু এগুলো নিয়েই করতে হবে এমন নয়, ষোলো ম্যাগাজিন, হারাম রিলেশনশিপ, স্ক্রিন আসক্তি নিয়ে লিফলেট বিতরণ, এলাকার রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা, মসজিদ পরিষ্কার করা, বৃক্ষরোপন এরকম অনেক কিছু নিয়ে হতে পারে। যেটা আপনাদের জন্য সুবিধাজনক হয়।
—
[১] সহীহ বুখারী, হাদিস নং ০১ [২] সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২৪০৯
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (
return (