যেসব বৈশিষ্ট্য থেকে একজন মুসলিম অ্যাক্টিভিস্টকে দূরে থাকতে হবে

যেসব বৈশিষ্ট্য থেকে একজন মুসলিম অ্যাক্টিভিস্টকে দূরে থাকতে হবে

সূরা আত-তাওবাহর ৪৭ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

لَوۡ خَرَجُوۡا فِیۡكُمۡ مَّا زَادُوۡكُمۡ اِلَّا خَبَالًا وَّ لَا۠اَوۡضَعُوۡا خِلٰلَكُمۡ یَبۡغُوۡنَكُمُ الۡفِتۡنَۃَ ۚ وَ فِیۡكُمۡ سَمّٰعُوۡنَ لَهُمۡ ؕ وَ اللّٰهُ عَلِیۡمٌۢ بِالظّٰلِمِیۡنَ

"যদি তারা তোমাদের সাথে বের হত, তবে তোমাদের মধ্যে ফাসাদই বৃদ্ধি করত এবং তোমাদের মাঝে ছুটোছুটি করত, তোমাদের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টির অনুসন্ধানে। আর তোমাদের মধ্যে রয়েছে তাদের কথা অধিক শ্রবণকারী, আর আল্লাহ যালিমদের সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত।"

রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সময়ের মুনাফিকদের উদ্দেশে আয়াতটি নাজিল হলেও, এর শিক্ষা কেবল সেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আয়াতে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ও আচরণের কথা বলা হয়েছে যা ঐক্য ও কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারে; তাই আল্লাহর পথে পরিচালিত যেকোনো সাংগঠনিক কাজে এর প্রাসঙ্গিকতা সর্বজনীন।

১. সন্দেহ ও বিভ্রান্তি ছড়ানো

এই বৈশিষ্ট্যের দুটি বিপজ্জনক রূপ আছে:

ক) গোপন সন্দেহ সৃষ্টিকারী: একজন ব্যক্তি হয়তো বাহ্যিকভাবে কাজের প্রতি নিবেদিত মনে হতে পারে, কিন্তু ব্যঙ্গ, সূক্ষ্ম অভিযোগ বা ব্যক্তিগত গীবত সমালোচনার মাধ্যমে সে নেতা বা সাথীদের উদ্দেশ্য বা মানহাজের যথার্থতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে। এটা আন্তরিকতার সাথে দেওয়া কোনো 'নসিহা' দেওয়ার মতো নয়, এটা ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো 'ফিতনা', যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।

খ) আন্তরিক কিন্তু উচ্ছৃঙ্খল: আরেকজন ব্যক্তি হয়তো আসলেই কাজের প্রতি নিবেদিত, কিন্তু তার আবেগের লাগাম, আত্ম-সচেতনতা, ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা বা সঠিক যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে সক্ষমতার অভাব আছে। অস্থিরতা, কর্কশ ভাষা, অন্যের প্রতি তাচ্ছিল্যের মনোভাব বা যেখানে-সেখানে হতাশা প্রকাশ ও সমালোচনা করার মাধ্যমে সে অনিচ্ছাকৃতভাবে একটি বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করে এবং অন্যদের মনোবল ভেঙে দেয়। দলের প্রতি কমিটমেন্ট থাকলেও, এমন ব্যক্তির আচরণ দিনশেষে দলের ক্ষতি করে।

২. গীবত ও পরনিন্দা

এই ধরনের ব্যক্তিরা সৎসাহস, আন্তরিকতা ও যথাযথ ফোরামে উদ্বেগ প্রকাশ করার পরিবর্তে, অপর ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে গীবত ও নামীমা করে বেড়ায়। সাথী ভাইদের নিয়ে উপহাস করে, অযথা ভুল ধরে কিংবা দোষারোপ করে। সামগ্রিকভাবে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করে যেখানে ভাইদের মধ্যেকার পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয় এবং যেখানে যেকোনো কাউকে সন্দেহ করা স্বাভাবিক হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাক। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ অধিক তাওবা কবূলকারী, অসীম দয়ালু। " [সূরা হুজুরাত (৪৯:১২)]

৩. সহকর্মীদের প্রতি বিদ্বেষ ও উপদল তৈরি (Factionalism)

বেশিরভাগ সময় এই সমস্যাটি নেতা-অনুসারী পর্যায়ে হয় না, বরং সহকর্মীদের মধ্যে হয়। একই স্তরের কর্মী একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা শুরু করে, উপদল তৈরি করে এবং একে অপরের উপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। নবী করীম (ﷺ) আমাদের এ ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন যে, হিংসা বা হাসাদ ভালো কাজকে এমনভাবে গ্রাস করে যেমন আগুন কাঠকে গ্রাস করে। এই উপদলগুলো অনৈক্য সৃষ্টি করে এবং কুরবানি ও আনুগত্যের সম্মিলিত চেতনাকে দুর্বল করে দেয়।

৪. নীরব অসহযোগিতা

এমন কিছু মানুষ থাকে যারা প্রকাশ্যে দ্বিমত পোষণ করবে না। কিন্তু কাজে গড়িমসি করে, চোখ উল্টায়, ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে, এমনভাবে নির্দেশ পালন করে যেন শুধু মানার জন্যই মানা। আসলে তারা দায়বদ্ধতা থেকে কাজ করে, আদর্শের জায়গা থেকে নয়। তারা কাজটাকে ‘ঔন’ করে না। তাদের এমন কার্যক্রম অন্যদেরকে দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি আঙুল তুলতে বাধ্য করে।

৫. ফিতনার বাহক হওয়া

সূরা তাওবাহ-য় আল্লাহ বলেন:

"আর তোমাদের মধ্যে রয়েছে তাদের কথা অধিক শ্রবণকারী।" [সূরা তাওবাহ (৯:৪৭)]

অর্থাৎ, কেবল তারাই নয় যারা ফিতনা ছড়ায়, বরং এমন লোকও আছে যারা আগ্রহ সহকারে তা গ্রহণ করে এবং ছড়িয়ে দেয়। আমরা কী বলব শুধু সেটা নিয়েই সতর্ক থাকব না—বরং কী ছড়াচ্ছি সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

৬. দায়িত্ব অবমূল্যায়ন

আরেকটি বিষাক্ত বৈশিষ্ট্য হলো যখন কেউ 'শুরা' (পরামর্শ) তে অংশগ্রহণ করে, শুরা থেকে একটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তাকে কাজও দেয়া হয় কিন্তু পরে সে সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে। তারা হয়তো নিজেদের টাস্ক অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, কাজের ব্যর্থতার নেতা অথবা পুরো টিমকে দোষারোপ করে, চেইন অব কমান্ডকে অবমূল্যায়ন করে, অথবা কে দায়ী সে বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়ায়।

এগুলো শৃঙ্খলা এবং আদবের অভাবে ঘটে, এবং সাংগঠনিক কাজকে অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ কাউকে জবাবদিহিতা থেকে মুক্তি দেয় না, বরং তা আরো বাড়িয়ে দেয়।

৭. প্রতিটি সিদ্ধান্তে আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা

কিছু ব্যক্তির একটি সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা থাকে—তাদের মতামত যেন সবসময় শোনা এবং অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তারা মনে করে প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করার হক তাদের আছে। যখন তাদের সাথে দ্বিমত দেখা দেয়, অথবা তাদের মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয় না, তখন তারা কেবল সিদ্ধান্তকে নয়, বরং যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যারা তাতে একমত হয়েছেন এবং বিশেষ করে যিনি তা বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন—সবার সমালোচনা করতে শুরু করে।

উল্লেখ্য ৬ ও ৭ নম্বর বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের সকল ঘরানার (ইসলামী কিংবা সেক্যূলার) বেশি দেখা যায়। সম্ভবত এটি আমাদের দায়িত্ববোধ ও শৃঙ্খলাবোধের অভাব এবং নিজেদের ব্যাপারে বাস্তবতাবিবর্জিত অতি উচ্চ ধারণা রাখার যে প্রবনতা আছে তার ফসল।

এর ফলে এমন এক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে যেখানে সাংগঠনিক কাজগুলো ব্যক্তিগত ইগোর কাছে জিম্মি হয়ে যায়। আপনি আসলে কতটা আন্তরিক, সেটা বোঝা যায় তখনই, যখন নিজের মত চাপিয়ে না দিয়ে, অন্যের মতকে আপনি প্রাধান্য দেন।

উপসংহার

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, একজন মুসলিম অ্যাক্টিভিস্টকে ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক উভয় স্তরেই কিছু নির্দিষ্ট নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য থেকে দূরে থাকতে হবে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ মুসলিম দলের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এগুলো শুধু ব্যক্তির আমলকেই নষ্ট করে না, বরং সমষ্টিগত প্রচেষ্টা, বিশ্বাস এবং অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করে। একজন প্রকৃত মুসলিম অ্যাক্টিভিস্টের উচিত সূরা তাওবার আয়াতসহ, কুরআন ও সুন্নাহর দিকনির্দেশনা, এবং দ্বীনের অন্যান্য মূলনীতি ও মেজাজের আলোকে আত্মপর্যবেক্ষণ করা। এই নিন্দনীয় বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে সুসংগঠিতভাবে দ্বীনের কাজে আত্মনিয়োগ করা। মনে রাখতে হবে, আল্লাহর পথে সফলতার জন্য ব্যক্তিগত পরিশুদ্ধি এবং পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য।

এই আলোচনার কিছুটা বিস্তারিত ভার্সন পড়ুন এখানে - www.activismlab.info/blog/stay-away-from-these-qualities-extended