অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা: ফান্ড ম্যানেজমেন্ট (সংক্ষিপ্ত ভার্সন)

গত আলোচনায় আমরা জেনেছি সকল শ্রেণীর মানুষের সাথে পাঠচক্র আয়োজনের উপায় এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা। এখন আমরা জানবো আমাদের সকল কাজ যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ফান্ড সংগ্রহের উপায় ও তার ম্যানেজমেন্ট করার বিস্তারিত কৌশল।
ফান্ড ম্যানেজমেন্ট
একটি আদর্শ ইউনিটের কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনার জন্য একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ভিত্তি অপরিহার্য। এই অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয় বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত ফান্ডের মাধ্যমে। তবে, শুধু ফান্ড সংগ্রহ করলেই হবে না, বরং এর সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। এই হ্যান্ডবুকটি এমন একটি নির্দেশনা, যা একটি ইউনিটকে ফান্ডের উৎস চিহ্নিত করা, তা সংগ্রহ করা এবং সুশৃঙ্খলভাবে তা ব্যয়ের ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। এখানে উল্লেখিত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করলে অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত হবে, যা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও টেকসই করে তুলবে ইনশা আল্লাহ।
ফান্ডের উৎস
একটি ইউনিটের ফান্ড সংগ্রহের জন্য একাধিক উৎস ব্যবহার করা যেতে পারে, যা ইউনিটকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করবে।
১. সদস্যদের চাঁদা
-
পদ্ধতি: ইউনিটের সদস্য (অ্যাক্টিভিস্ট, মুনতাসিব এবং আগ্রহী মুয়াফিক) মাসিক চাঁদা দেবেন। দায়িত্বশীলদের উচিত সদস্যদের ব্যক্তিগত সমস্যার প্রতি খেয়াল রাখা।
-
সহজ উপায়: ক. প্রতিদিন ২ টাকা জমালে মাসে ৬০ টাকা জোগাড় হবে। খ. প্রতিদিন ১ মুঠো চাল আলাদা করে রাখলে মাসে ৩০ মুঠো চাল হবে।
এভাবে চাঁদা দিলে সদস্যদের ওপর চাপ পড়বে না এবং চাঁদার পরিমাণ কম রাখলে সবার জন্য সুবিধা হবে।
২. ক্রাউডফান্ডিং
এটি ফান্ড সংগ্রহের সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
- লক্ষ্য: এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তি, মুরুব্বি, সচেতন মানুষ এবং সাধারণ জনগণের কাছ থেকে ফান্ড সংগ্রহ করা।
- ক্ষেত্র: অনলাইনের মাধ্যমে পুরো দেশ বা উম্মাহর যেকোনো প্রান্ত থেকে ফান্ড তোলা সম্ভব।
৩. স্পন্সরশিপ
- উৎস: স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বইয়ের প্রকাশনী বা বিভিন্ন অনলাইন ব্যবসা থেকে স্পন্সর নেওয়া যেতে পারে।
- শর্ত: ব্যবসা অবশ্যই হালাল হতে হবে এবং জনগণের সঙ্গে কোনো ধরনের প্রতারণা করবে না এমন হতে হবে।
৪. হালাল ব্যবসায় বিনিয়োগ ও পণ্য বিক্রি
-
বিনিয়োগ: হাঁস, মুরগি, ছাগল পালন অথবা হালাল ব্যবসায় বুঝে-শুনে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় মূলধন হারানোর ঝুঁকি বেশি, তাই ব্যবসায় বিনিয়োগের এই পদ্ধতি এড়িয়ে চলাই ভালো।
-
পণ্য বিক্রি: ক. জুমার নামাজের পর, রমজান বা ঈদের সময় বিভিন্ন প্রতীকী টি-শার্ট, মগ, ক্যাপ, ডায়েরি, আতর ইত্যাদি বিক্রি করা যেতে পারে। খ. বিভিন্ন ক্যাম্পেইনের সামগ্রী, যেমন: বই, লিফলেট, পোস্টার, বুকলেট ইত্যাদি বিক্রি করেও ফান্ড সংগ্রহ সম্ভব। তবে এই ধরনের কাজে সবার মধ্যে ত্যাগের বা কোরবানির মানসিকতা থাকতে হবে।
ফান্ড সংগ্রহের ক্ষেত্রে সতর্কতা
- অল্পসংখ্যক ব্যক্তির ওপর নির্ভরতা পরিহার: শুধুমাত্র একজন বা অল্প কয়েকজনের ওপর ফান্ডের জন্য নির্ভর করবেন না। এতে তারা নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে পারে এবং ফান্ড বন্ধ হলে পুরো ইউনিট সংকটে পড়বে।
- একাধিক উৎস: "এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখবেন না।" বিকল্প একাধিক উৎস রাখুন। একটি উৎস বন্ধ হয়ে গেলেও যেন অন্যগুলো দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়।
- ব্যাপক অংশগ্রহণ: ফান্ডের পরিমাণ অল্প হলেও যত বেশি মানুষের কাছ থেকে ফান্ড নেওয়া যাবে, আপনার ইউনিট তত বেশি টেকসই হবে। যেমন: ১০ জন মানুষের কাছ থেকে ১ হাজার টাকা নেওয়ার চেয়ে ১০০০ জন মানুষের কাছ থেকে মাসিক ১০ টাকা করে নেওয়া অনেক বেশি নিরাপদ।
—
বাৎসরিক বাজেট তৈরি
-
লক্ষ্য: ১ বছরে কত টাকা লাগতে পারে, কোন খাতে কত খরচ হবে, বর্তমানে কত টাকা আছে এবং সম্ভাব্য ঘাটতি কত—এর একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া।
-
পরিকল্পনা: সম্ভাব্য আয়ের উৎস এবং কখন ফান্ড তোলার ক্যাম্পেইন করতে হবে, কি কি করতে হবে, তা বাজেটে উল্লেখ করুন ।
-
সুবিধা: বাজেট তৈরি করলে ইউনিটের অর্থনৈতিক হিসাব অনেক সহজ হবে। বাৎসরিক বাজেটকে ৬ মাস, ৩ মাস বা ১ মাসের বাজেটে ভাগ করে ফেলা যেতে পারে।

পরিশিষ্ট ৬ এ একটি সহজ নমুনা বাজেট যুক্ত করা হলো
—
ফান্ড সংগ্রহের উপযুক্ত সময়
ফান্ড সংগ্রহের জন্য কিছু উপযুক্ত সময় রয়েছে, যখন মানুষের মধ্যে দান করার আগ্রহ বেশি থাকে।
-
ক্যাম্পেইনের পরে: প্রত্যেক সফল ক্যাম্পেইনের পর ফান্ড সংগ্রহ করা যায়।
-
ধর্মীয় উৎসব: ১. রমজান মাস। ২. শুক্রবার। ৩. ঈদের নামাজের পর।
-
আর্থিক সচ্ছলতার সময়: ১. মাসের শুরুতে। ২. ঈদের আগে বোনাস পাওয়ার সময়। ৩. ফসল তোলার মৌসুমে।
—
নতুনদের জন্য ফান্ড ম্যানেজমেন্ট
১. পরিচয় তৈরি: "তরুণ সঙ্ঘ মিরপুর" বা "কুষ্টিয়ার তরুণ সমাজ"-এর মতো এলাকার নাম দিয়ে একটি সোশ্যাল মিডিয়া পেজ খুলতে হবে। নামকরণের ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন এই লেখাটি - ইউনিটের নামকরণ
২. ছোট কাজ দিয়ে শুরু: সদস্যরা নিজেদের চাঁদা থেকে ১০০ টাকার মতো জমা করে কিছু লিফলেট ক্রয় করে বিতরণ বা একটি ষোলো ম্যাগাজিন কিনে পাঠচক্র শুরু করুন।
৩. প্রচার: এসব কাজের ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করুন এবং স্থানীয় মানুষ ও অন্যান্য ইউনিটকে দিয়ে শেয়ার করান।
৪. সহযোগিতা চাওয়া: পরবর্তীতে আরও ভালো কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অন্যদের কাছে সহযোগিতা চান। এভাবে স্থানীয় সচেতন মানুষদের কাছে ফান্ড চাওয়া যেতে পারে এবং নতুন সদস্যও যুক্ত হবে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন এই লেখাটি - একাকী একেবারে শূন্য থেকে ক্যাম্পেইন শুরু…
ডোনার ধরে রাখার কৌশল
- যোগাযোগ: দাতাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন।
- আপডেট: একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ক্যাম্পেইনের আপডেট ও সফলতার রিপোর্ট দিন।
- অংশগ্রহণ: বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ক্যাম্পেইনে তাদের আমন্ত্রণ জানান এবং স্বেচ্ছাশ্রম হওয়ার প্রস্তাব দিন।
- স্বচ্ছতা: লেনদেনে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখুন এবং কথা দিয়ে কথা রাখুন।
- ডোনারের প্রতি সংবেদনশীলতা: ডোনারদের সুবিধা-অসুবিধা বুঝুন এবং তাদের কোনোভাবে বিব্রত করবেন না।
ক্যাম্পেইনের বাইরে ফান্ড রেইজিং
- উপাদান: ইউনিটের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, সফলতা ও নিয়মিত কার্যক্রম উল্লেখ করে ভিডিও বা পিডিএফ তৈরি করুন যাকে বলা হয় সফলতার রিপোর্ট। প্রয়োগ: সম্ভাব্য ডোনারদের কাছে তা পাঠান এবং ব্যক্তিগতভাবে গিয়ে প্রেজেন্টেশন দিন।
সফলতার রিপোর্টের কিছু নমুনা পরিশিষ্ট-৭এ যুক্ত করা হলো।
—
হিসাব রাখার পদ্ধতি
যেকোনো ইউনিটের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য হিসাব রাখা অপরিহার্য। মাসিক হিসাব মূলত দুই ধরনের হবে: নির্দিষ্ট আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং সামগ্রিক আয়-ব্যয়ের হিসাব।
১. নির্দিষ্ট আয়-ব্যয়ের হিসাব
এটি আপনার লেনদেনের বিস্তারিত বিবরণ।
- হিসাব লিপিবদ্ধকরণ: একটি নির্দিষ্ট খাতা বা স্প্রেডশিটে প্রতিটি লেনদেনের তারিখ অনুসারে টাকা জমা ও খরচের হিসাব রাখতে হবে। যেমন, মাসের ৩ তারিখে ৫০০ টাকা এলে তা সেদিনই লিখতে হবে। ৫ তারিখে ১০০০ টাকা খরচ হলে তাও সাথে সাথেই লিখে ফেলতে হবে।
- বিস্তারিত তথ্য: আয় ও ব্যয়ের তারিখ, খাত/বিভাগ, উৎস এবং কাজের বিবরণ স্পষ্টভাবে লিখে রাখতে হবে। এটি হিসাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।

২. সামগ্রিক আয়-ব্যয়ের হিসাব
এটি নির্দিষ্ট হিসাবের চেয়ে কম বিস্তারিত, তবে এটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে।
- সারসংক্ষেপ: এখানে নির্দিষ্ট কোনো বিবরণ থাকবে না, বরং পুরো মাসে মোট কত টাকা আয় হয়েছে এবং কত টাকা খরচ হয়েছে তার একটি সারসংক্ষেপ থাকবে।
- সামঞ্জস্যতা: সামগ্রিক হিসাব অবশ্যই নির্দিষ্ট হিসাবের সঙ্গে মিলতে হবে।
- সংরক্ষণ ও বার্ষিক হিসাব: এই হিসাবগুলো খুব ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। একটি ইউনিট যতদিন থাকবে, ততদিন এই হিসাবগুলো রাখতে হবে। বছর শেষে ১২ মাসের হিসাব মিলিয়ে একটি বাৎসরিক হিসাব তৈরি করতে হবে।

—
লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্কতা: আইন ও নৈতিকতা
ফান্ড সংগ্রহ ও ব্যয়ের সময় কিছু আইনি ও নৈতিক দিক সম্পর্কে সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি। এই সতর্কতাগুলো আপনার ইউনিট ও এর সদস্যদেরকে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি থেকে রক্ষা করবে এবং কার্যক্রমের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করবে।
১. সন্দেহজনক লেনদেন এড়িয়ে চলুন
এমন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ফান্ড গ্রহণ করা যাবে না, যারা কোনো নিষিদ্ধ বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত।এই ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করার মূল উদ্দেশ্য হলো আপনার কার্যক্রম ও অ্যাক্টিভিস্টদের নিরাপদ রাখা এবং কোনো অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিতে না জড়ানো।
২. বেনামি ফান্ড গ্রহণ নয়:
- পরিচয়ের স্বচ্ছতা: বেনামী বা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি বড় অঙ্কের টাকা বা নিয়মিত চাঁদা দিতে চায়, তা গ্রহণ করা যাবে না।তবে, যদি কোনো দাতা তার নাম প্রকাশ করতে না চান (যেমন: রিয়ার আশংকা বা গোপন আমলের উদ্দেশ্যে), সেক্ষেত্রে তার পরিচয় আইনিভাবে ও অন্যান্য দায়িত্বশীলদের কাছে প্রকাশ করার শর্তে ফান্ড নেওয়া যেতে পারে।
- আয়ের উৎস: ফান্ড গ্রহণ করার আগে দাতার আয়ের উৎস হালাল ও বৈধ কিনা, তা নিশ্চিত করতে হবে। ক্রাউডফান্ডিংয়ের সময় স্পষ্টভাবে বলে দিতে হবে যেন সুদ বা ঘুষের টাকা দান করা না হয়।
৩. রাজনৈতিক দলের ফান্ড পরিহার:
- স্বাধীনতা: রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে ফান্ড নেবেন না। এতে আপনার ইউনিট তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে এবং আপনি আপনার স্বাধীনতা হারাবেন।
- গ্রহণযোগ্যতা: কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হলে আপনার ইউনিট সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। যারা ঐ দলকে পছন্দ করে না, তারা আপনাদের থেকে দূরে থাকবে এবং অনুদান দেবে না।
- নিরাপত্তা ঝুঁকি: আপনার ইউনিট ও সদস্যদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে, কারণ কোনো রাজনৈতিক দলই তাদের নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কাজ করে না।
৪. লিখিত প্রমাণ সংরক্ষণ
- প্রতিটি লেনদেনের লিখিত প্রমাণ রাখা বাধ্যতামূলক। প্রদানকারীর নাম, টাকার পরিমাণ, তারিখ, খরচের খাত এবং লেনদেনের মাধ্যম (যেমন: ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং) স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করুন।
- ক্রাউডফান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি ব্যক্তিকে আলাদাভাবে যাচাই করা কঠিন হলেও, তাদের মোবাইল নম্বর, ট্রানজেকশন আইডি এবং টাকার পরিমাণের হিসাব রাখুন।
- প্রতিটি খরচের জন্য মানি রসিদ বা ডকুমেন্ট সংরক্ষণ করুন, এমনকি তা ১০ টাকার জন্যও প্রযোজ্য। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।
৫. ফান্ডের নির্দিষ্ট ব্যবহার
- প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন: আপনার ইউনিটের ফান্ড যে উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে, সেই উদ্দেশ্যেই তা ব্যয় করতে হবে। যেমন, সাধারণ কার্যক্রমের জন্য সংগৃহীত টাকা দিয়ে কোনো ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাহায্য করা যাবে না, কারণ এটি দাতাদের প্রতি করা কথার বরখেলাপ।
- অন্য ইউনিটকে ফান্ড প্রদান করা যাবে না: আপনার ইউনিটের ফান্ড অন্য কোনো ইউনিটকে দেওয়া যাবে না। তাদের কার্যক্রমের ওপর আপনার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এবং তাদের যেকোনো অপ্রত্যাশিত কাজের জন্য আপনারাও আইনি ঝামেলায় পড়তে পারেন।
৬. যাদের বিরুদ্ধে কাজ করা হবে, তাদের ফান্ড গ্রহণ নয়
যাদের বিরুদ্ধে আপনার ইউনিট কাজ করে (যেমন, ব্র্যাক), তাদের কাছ থেকে ফান্ড নেবেন না। এমন করলে তারা আপনাকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে আপনার কাজ থামিয়ে দিতে চাইতে পারে এবং চক্ষুলজ্জার কারণে আপনি তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারবেন না।
৭. দাতার সঙ্গে স্বচ্ছ চুক্তি
- মিশন ও ভিশন: ফান্ড নেওয়ার আগে দাতার কাছে আপনার ইউনিটের মিশন, ভিশন ও কর্মপদ্ধতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরুন।
- অযাচিত হস্তক্ষেপ নয়: ভদ্রভাবে বুঝিয়ে দিন যে, ইউনিট পরিচালনার ক্ষেত্রে দাতা যেন অযাচিত হস্তক্ষেপ না করেন।
৮. অনলাইন ব্যাকআপ
সকল হিসাবের অনলাইন কপির ব্যাকআপ কমপক্ষে দুটি ভিন্ন জায়গায় রাখুন। এতে কোনো কপি হারিয়ে গেলে, মুছে গেলে বা ডিভাইস নষ্ট হয়ে গেলেও আপনার কাছে আরেকটি কপি থাকবে।
—
গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা
১. পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাবরক্ষণ
ডোনেশন ও ব্যয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখা বাধ্যতামূলক। হিসাব কাউকে বুঝিয়ে দেবার দরকার হলে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রেখে তা করতে সক্ষম হতে হবে।
২. নির্দিষ্ট দায়িত্বশীল
ইউনিটের অর্থের দায়িত্ব একজন নির্দিষ্ট সদস্যকে (যেমন: অর্থ সম্পাদক) দিতে হবে। এতে আর্থিক লেনদেনে শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।
৩. খরচের ব্যাপারে সতর্কতা
- সাশ্রয়ী হোন: খরচ সবসময় কমিয়ে আনার বা আওতার মধ্যে রাখার চেষ্টা করতে হবে।
- অপ্রয়োজনীয় ব্যয় পরিহার: নাস্তা-পানির ক্ষেত্রে দামি খাবারের পরিবর্তে কম দামি খাবার বেছে নিতে হবে।
- গণপরিবহন ব্যবহার: যাতায়াতের সময় যদি খুব জরুরি না হয়, তাহলে পাঠাও, উবার বা রিকশার বদলে বাস বা অটোর মতো গণপরিবহন ব্যবহার করতে হবে।
ফান্ডের কৌশলী ব্যবহার:
- সদস্যদের চাঁদা: এই ফান্ড থেকে সদস্যদের ব্যক্তিগত বা স্টাফ খরচ (যেমন: নাস্তা ও যাতায়াত) মেটানোর চেষ্টা করুন।
- ডোনারদের ফান্ড: ডোনারদের দেওয়া অর্থ দিয়ে কেবল অ্যাক্টিভিজম সংক্রান্ত খরচ, যেমন: ক্যাম্পেইন ম্যাটেরিয়ালস ক্রয়, বুস্ট, এডিটিং ও মার্কেটিংয়ের খরচ মেটাবেন। এতে "উম্মাহর টাকা নষ্ট করা হচ্ছে" এমন অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকা যাবে।
- সরাসরি পেমেন্ট: ক্যাম্পেইনের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী (যেমন: লিফলেট) সরাসরি ডোনারদের দিয়ে কেনানো যেতে পারে। যেমন, "অমুক দোকান থেকে ১ হাজার কপি লিফলেট নেব, আপনি উনাদের পেমেন্ট করুন।"
মাথায় রাখুন: আমানতের খেয়ানত করা মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (ﷺ) নির্দেশ অনুযায়ী, আমানত রক্ষা করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, "আল্লাহ যখন তার কোনো বান্দাকে কিছু লোকের দায়িত্বশীল নিয়োগ করেন, অতঃপর সে খেয়ানতকারী হিসাবে মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তার উপর জান্নাতকে হারাম করে দেন।" [মুসলিম হা/১৪২; রাবী মা‘ক্বিল বিন ইয়াসার (রা.)।]
- তিনি ﷺ গণীমতের মালের দুই দিরহাম বা তার কম মূল্যের তুচ্ছ বস্ত্তর খেয়ানতকারীর জানাজার সালাত পড়েননি। [সহিহ ইবনু হিব্বান হা/৪৮৫৩।]
এসব নির্দেশনা মেনে চললে আপনার ইউনিট আর্থিক দিক থেকে সুশৃঙ্খল হবে এবং আল্লাহ তা'আলার কাছে আমানতদার হিসাবে গণ্য হবে।
বিস্তারিত আলোচনার জন্য পড়ুন - ফান্ড SOP
সফলভাবে ফান্ড ম্যানেজমেন্টের মূল চাবিকাঠি হলো স্বচ্ছতা, বিকল্প উৎস তৈরি এবং সদস্যদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে, যেকোনো ফান্ডের আমানত রক্ষা করা একটি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। ডোনারদের বিশ্বাস অর্জন এবং তা ধরে রাখার জন্য সকল লেনদেন ও হিসাবের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে হবে। এই নির্দেশিকায় উল্লেখিত নীতিগুলো মেনে চললে একটি ইউনিট কেবল অর্থনৈতিকভাবেই স্বাবলম্বী হবে না, বরং এর মাধ্যমে সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও নৈতিকতাও বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিকভাবে একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য সংগঠন গড়ে তুলতে সহায়ক হবে ইনশা আল্লাহ।
return (